• Today: সোমবার, ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২রা মার্চ, ২০২৬ ইং, সকাল ১০:১৫

Breaking News:

শেষাচলম পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত তিরুমালা তিরুপতি

তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম্‌ (টিটিডি) একটি অছি পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত হয়। ১৯৫১ সালে এই অছির সদস্য সংখ্যা ছিল ৫। ২০১৫ সালে একটি আইন পাস করে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ করা হয়েছে। টিটিডির দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনার জন্য একজন কার্যনির্বাহী আধিকারিক দায়ী থাকেন।

এই আধিকারিককে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার নিয়োগ করে। প্রতিদিন এই মন্দিরে প্রায় ৭৫,০০০ তীর্থযাত্রী আসেন।২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে এই মন্দিরের বার্ষিক বাজেট ধরা হয়েছে ২৫৩০.১০ কোটি টাকা। এই বাজেট ও ভক্তদের দান থেকে দাতব্য অছি পরিষদগুলি চলে। মন্দিরের বার্ষিক বাজেট থেকে মন্দিরের জনপ্রিয়তা অনুমান করা যায়। ২০০৮ সালে এই মন্দিরের বার্ষিক আয় ছিল ১০ বিলিয়ন টাকা। শ্রীবারি হুন্ডি ভক্তদের দান থেকে মন্দিরের প্রধান আয় হয়।

ভক্তেরা টিটিডি-কে যে পরিমাণ অর্থ দান করেন, তার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াও টিটিডি একাধিক দাতব্য অছি পরিষদ পরিচালনা করে। এগুলিও বাজেট ভক্তদের দানের টাকায় চলে।

বাইরে থেকে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য তিনটি ‘দ্বারম্‌’ বা প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রথম প্রবেশদ্বারটির নাম ‘মহাদ্বারম্‌’ বা ‘পদিকাবলি’। এটি ‘মহাপ্রাকারম্‌’ বা চত্বরের বাইরের প্রাচীরে অবস্থিত। মহাদ্বারমের উপর একটি ৫০ ফুট উঁচু পাঁচ-তলা ‘গোপুরম্‌’ (মন্দিরের মিনার) রয়েছে। এই গোপুরমের চূড়ায় সাতটি কলস স্থাপিত রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রবেশদ্বারটির নাম ‘বেন্দিবাকিলি’ বা রৌপ্যদ্বার। এটি ‘নাদিমিপদিকাবলি’ নামেও পরিচিত। এটি মন্দিরের ভিতরের প্রাচীর ‘সম্পঙ্গি প্রাকারমে’র গায়ে অবস্থিত। এই প্রবেশপথটির উপর একটি তিন-তলা গোপুরম রয়েছে। এই গোপুরমের উপরেও সাতটি কলস স্থাপিত আছে।

গর্ভগৃহে প্রবেশের দরজাটির নাম হল ‘বঙ্গারুবাকিলি’ বা স্বর্ণদ্বার। এই পথের দুই পাশে দ্বারপাল জয় ও বিজয়ের দুটি লম্বা তাম্রমূর্তি স্থাপিত। মোটা কাঠে নির্মিত এই দরজাটির উপর সোনার গিলটি করা পাতে বিষ্ণুর দশাবতারের ছবি খোদিত রয়েছে।

মন্দিরের গর্ভগৃহের বা দেববিগ্রহের চারপাশের বৃত্তাকার অংশটিকে বলা হয় ‘প্রদক্ষিণম্‌’ (প্রদক্ষিণের পথ)। প্রদক্ষিণের জন্য তিরুমালা বেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে দুটি পথ রয়েছে। প্রথম পথটি রয়েছে মহাপ্রাকারম ও সম্পঙ্গি প্রাকারমের মধ্যস্থলে।

এই পথটির নাম ‘সম্পঙ্গি প্রদক্ষিণম্‌’। এই পথটিতে একাধিক মণ্ডপ, ধ্বজাস্থলম্‌, বলিপিটম্‌, ক্ষেত্রপালিকা শিলা, প্রসাদ বিতরণ স্থল ইত্যাদি রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রদক্ষিণ পথটির নাম ‘বিমানপ্রদক্ষিণম’। এটি আনন্দ-নিলয়ম-বিমানমের চারপাশে অবস্থিত। এই পথেই বরদারাজ ও যোগ-নৃসিংহ মন্দির, ‘পোটু’ (মন্দিরের প্রধান পাকশালা), ‘বঙ্গারু ববি’ (সুবর্ণ কূপ), ‘অঙ্কুরারপানা মণ্ডপম্‌’, যাগশালা, ‘নানালা’ (মুদ্রাভাণ্ড) ও ‘নোটলা’ (কাগজের নোটের ভাণ্ড), ‘পারকামানি’, ‘চন্দনপু আরা’ (চন্দনের আলমারি), মহাফেজখানা, ‘সন্নিধি ভাষ্যকুরুলু’, বেঙ্কটেশ্বরের হুন্ডি ও বিশ্বকসেনের আসন অবস্থিত।

তিরুমালা বেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে প্রধান উপাস্য দেবতা বেঙ্কটেশ্বরের বিগ্রহ ও কয়েকটি ছোটো মূর্তি রয়েছে মন্দিরের গর্ভগৃহে। স্বর্ণদ্বার দিয়ে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হয়। বঙ্গারুবাকিলি ও গর্ভগৃহের মধ্যে আরও দুটি দরজা রয়েছে। তীর্থযাত্রীদের গর্ভগৃহের ভিতরে ও ‘কুলশেখরপদী’ পথের ভিতরে আসতে দেওয়া হয় না।
মন্দিরের গর্ভগৃহের উপরে অবস্থিত নির্মিত প্রধান গোপুরমটির নাম আনন্দ-নিলয়ম্‌-বিমানম্‌। এটি একটি তিন-তলা গোপুরম।

এই চূড়ায় একটিমাত্র কলস স্থাপিত রয়েছে। এই গোপুরমটি গিল্‌টি করা রুপোর মাতে মোড়া এবং একটি সোনার পাত্র দ্বারা আবৃত। এই গোপুরমে অনেক দেবমূর্তি খোদিত রয়েছে। তার মধ্যে বেঙ্কটেশ্বরের মূর্তিটি ‘বিমান-বেঙ্কটেশ্বর’ নামে পরিচিত। এটিকে গর্ভগৃহের মূর্তিটির যথাযথ প্রতিমূর্তি মনে করা হয়।

মূলবিরাট বা ধ্রুব বেরাম্‌ – তিরুমালা বেঙ্কটেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহে বেঙ্কটেশ্বরের প্রধান বিগ্রহটিকে বলা হয় ‘ধ্রুব বেরাম্‌’। ‘ধ্রুব’ শব্দের অর্থ স্থায়ী এবং ‘বেরাম্‌’ শব্দের অর্থ ‘দেবতা’। এই বিগ্রহটি একটি প্রস্তর-বিগ্রহ। বিগ্রহটি পা থেকে মুকুটের চূড়া অবধি ৮ ফুট (২.৪ মিটার) লম্বা। বিগ্রহটিতে বেঙ্কটেশ্বরকে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যায়। তার উপরের দুটি হাতে শঙ্খ ও সুদর্শন চক্র এবং নিচের দুটি হাতের মধ্যে একটি হাতে বরদা মুদ্রা ও অপর হাতটি উরুর উপর রাখা। বিগ্রহটি নানা মূল্যবান অলংকারে শোভিত। বিগ্রহের বুকের ডানদিকে লক্ষ্মী ও বাঁদিকে পদ্মাবতীর অবস্থান। এই বিগ্রহটিকে মন্দিরের শক্তির প্রধান উৎস মনে করা হয়।

কৌতুক বেরাম্‌ বা ভোগ শ্রীনিবাস — ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে পল্লব রানি সামাবাই পেরিনদেবী এই এক ফুট (০.৩ মিটার) উঁচু রুপোর মূর্তিটি মন্দিরকে দান করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার পর এটিকে কখনও মন্দিরের বাইরে আনা হয়নি। মূর্তিটির জনপ্রিয় নাম ‘ভোগ শ্রীনিবাস’। কারণ মহাবিরাটের সব জাগতিক সুখ এই মূর্তিটি ভোগ করেন। এই বিগ্রহটিকে প্রতিদিন রাতে একটি সোনার বিছানায় শোয়ানো হয় এবং প্রতি বুধবার এঁর সহস্র কলসাভিষেকম্‌ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। মূর্তিটিকে সর্বদা মূলবিরাটের বাঁপায়ের কাছে একটি পবিত্র ‘সম্বন্ধ ক্রুচে’র দ্বারা মূল বিগ্রহের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা হয়। মূর্তিটিকে ভক্তদের থেকে ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে রাখা হয়, কারণ এই মূর্তিটির একটি ‘প্রয়োগ’ (সদা ব্যবহারোন্মুখ) চক্র রয়েছে।

স্নাপন বেরাম্‌ বা উগ্র শ্রীনিবাস — এই মূর্তিটি বেঙ্কটেশ্বরের ক্রুদ্ধ রূপের প্রতিরূপ। এটিও গর্ভগৃহে রাখা থাকে। শুধুমাত্র কৈশিকা দ্বাদশী তিথিতে সূর্যোদয়ের পূর্বে একবার বাইরে আনা হয়। ‘স্নাপন’ শব্দের অর্থ স্নান করানো। প্রতিদিন এই মূর্তিটিকে পবিত্র জল, দুধ, দই, ঘি, চন্দন, কুমকুম ইত্যাদি দিয়ে স্নান করানো হয়।

উৎসব বেরাম্‌ বা মালায়াপ্পা স্বামী — ভক্তদের দর্শনের জন্য বেঙ্কটেশ্বরের এই মূর্তিটি বাইরে আনা হয়। এই মূর্তিটিকে মালায়াপ্পাও বলা হয়। এই মূর্তির সঙ্গে এঁর দুই পত্নী শ্রীদেবী ও ভূদেবীও থাকেন। তিরুমালা পর্বতের মালায়াপ্পান কোনাই গুহায় এই মূর্তিগুলি পাওয়া গিয়েছিল। প্রথম দিকে উগ্র শ্রীনিবাসকে উৎসব বেরাম্‌ (শোভাযাত্রায় নির্গত মূর্তি) করা হত। কিন্তু সেই সময় শোভাযাত্রার সময় প্রায়ই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটত। কথিত আছে, ভক্তেরা সমাধানের জন্য বেঙ্কটেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলে তিনি স্বপ্নে তিরুমালা পর্বতের গুহায় লুক্কায়িত মূর্তিগুলি খুঁজে বের করার আদেশ দেন। খোঁজা শুরু হয় এবং খুঁজে পাওয়ার পর গ্রামবাসীরা এই মূর্তির নাম রাখেন ‘মালায়াপ্পা’ বা ‘পর্বতের রাজা’। এই মূর্তিগুলি মন্দিরে আনার পর নিত্য কল্যাণোৎসবম্‌, সহস্র দীপালংকার সেবা, অর্জিত ব্রহ্মোৎসবম্‌, নিত্যোৎসবম্‌, দোলোৎসবম্‌ ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে মন্দিরে তীর্থযাত্রীর সমাগম বৃদ্ধি পায়। এই মূর্তিগুলির উদ্দেশ্যে ভক্তেরা কোটি কোটি টাকা দান করেন।

বলি বেরাম্‌ বা কোলুভু শ্রীনিবাস — এই পঞ্চলোহা মূর্তিটি মূল মূর্তির প্রতিরূপ। এই মূর্তিটিকে মন্দিরের সব কাজ ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রধান আধিকারিকের প্রতিনিধি মনে করা হয়। এটিকে বলি বেরাম্‌ও বলা হয়। কোলুভু শ্রীনিবাস হলেন মন্দিরের রক্ষাকর্তা দেবতা। এঁকে মন্দিরের অর্থনৈতিক বিষয়ের অধিকর্তাও মনে করা হয়। দৈনিক উপচারগুলি এই মূর্তির প্রতি নিবেদিত হয়। প্রতি বছর জুলাই মাসে হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে দক্ষিণায়ন সংক্রমণের সময় অর্থবর্ষের সমাপ্তি উপলক্ষে মন্দিরে ‘অনিবার অস্থানম্‌’ অনুষ্ঠান উদ্‌যাপিত হয়।

Like us on Facebook

Archives

Categories

Meta